অনুবাদ / প্রবন্ধ / বই আলোচনা / বিশ্বসাহিত্যে ভ্রমণ

কেন ভনেগাট ও চ্যাম্পিয়নদের ব্রেকফাস্ট বাংলায় | এনামুল রেজা

লোকটার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা… ভুলে গিয়েছি। মনে পড়ছেনা। কিন্তু বুকশেলফ থেকে লাল রঙের বইটা হাতে উঠাতেই খেয়াল হয় কোন এক বৈশাখের দিনে নীলক্ষেত থেকে আমি ওটা কিনেছিলাম। লাল মলাট, হলুদ একটা মাথার খুলি। এইটা সায়েন্স ফিকশন নাকি যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস?

ছত্রিশ নম্বর বাসে ঘরে ফিরছিলাম। মানিক মিয়া এভিনিউতে এসে বাস কিছুটা খালি হয়ে গেল। পাশে এসে বসলো ঝাঁকড়াচুলো এক ভদ্রলোক। এই গরমেও সুট পরে আছেন। নাকের নিচে মোটা গোঁফ। তাকে দেখে আমার গরম আরও বেড়ে গেল।

মনোযোগ ডাইভার্ট করতে প্যাকেট খুলে লাল বইটার পাতা উল্টাতে লাগলাম। এমন আগেও হয়েছে। নতুন বই কিনে সেটা বাসা পর্যন্ত ইনট্যাক্ট নিয়ে যাওয়ার ধৈর্য কখনওই থাকেনা আমার।
লোকটি জিজ্ঞেস করলো, ‘কী বই এটা? ভাল?’
বললাম, ‘এখনও পড়িনি।’
‘তা কী বিষয়ে লেখা?’
‘নভেল।’
‘মানে কী নিয়ে লেখা নভেল?’
লোকটার আজব কৌতূহল। দেখছেন যে কথা কইতে আমার ইচ্ছে নেই, প্রশ্ন থামছে না তবু। বয়স্ক মানুষ, সে চিন্তায় বললাম, ‘এখনও আসলে জানিনা, খুব নাম শুনেছি। বিখ্যাত যুদ্ধবিরোধী বই নাকি। অনেকে সায়েন্স ফিকশনও বলেন।’
লোকটা শুনে কী বুঝল কে জানে। কয়েকবার মাথা নাড়িয়ে বিড়বিড় করল, ‘এহ যুদ্ধবিরোধী… কইলেই হইল.. সায়েন্সের অয় বোঝে কী…’
অবাক হয়ে আরেকবার তাকালাম তার দিকে। মুখটা এত পরিচিত মনে হচ্ছে কেন বুঝলাম না।
‘আংকেল, আপনি চিনেন নাকি এই রাইটারকে?’
‘এক কালে চিনার ট্রাই করতাম। এখন বাদ দিছি। খুবই ট্যাটনা লেখক অয়।’
‘তাহলে এই বইটা পড়েছেন? কেমন বই বলেন তো।’
‘কিনছ নিজে, আর আমারে জিগাও কেমন বই। ফালতু।’
‘সরি! আমাকে ফালতু বললেন?’
‘না। তোমারে কেন বলবো। তুমি আমার কী লাগো মিয়া?’

এই প্রথম মনে খটকা লাগল। এক পাগলের পাল্লায় পড়েছি। বইটই পড়ে এমন পাগলাটে লোকের অভাব আছে জগতে? আমাদের টাইম্যানের কথাও এক ঝলক মনে পড়ল। পায়ে চপ্পল আর পরণে লুঙ্গি থাকলেও টাই নামাতোনা কখনও গলা থেকে।রাস্তায় চেনা কাউকে দেখলেই নাম ধরে ডেকে এগিয়ে আসত, ‘আরে, ঐদিন তোমাকে না বাখাতিনের আখ্যানতত্ত্ব নিয়ে বলছিলাম? এসো বাকিটা বুঝিয়ে দেই।’

আর কিছু না বলে আমি বইয়ের পাতায় মন দিলাম। মন বসলোনা। বিজয় স্মরণির কাছাকাছি কেউ বাইক একসিডেন্ট করেছে রিকশার সঙ্গে। ছুটির দিন। জ্যাম ছিলনা। কিন্তু জটলা পাকিয়েছে ভালোই। কিছু সময় পর দেখলাম তুবড়ানো বাইকটা ভ্যানে উঠিয়ে দিল সবাই মিলে।

কিন্তু পাশের লোকটা কোন ফাঁকে নেমে গেল?

আরও বছর দুয়েক কেটে গেছে। নীলক্ষেতের ফ্রেন্ডস বুকশপে প্রায় যেতাম তখন, সেদিনও গেছি। বান্ধবী ছোট্ট করিডোরে পাতা চেয়ারে বসে মোবাইল টিপছে। আমি ঘুরে ঘুরে বই দেখছি। অনেকক্ষণ পার হয়ে হয়ে যাওয়ার পরেও কিছু পছন্দ করতে পারিনাই। দোকানের লোকজন আমার পরিচিত হলেও একটু কেমন বিব্রতও লাগছে। ঠিক তখন একটা বইয়ের দিকে চোখ পড়ল।

কমলা মলাট। উপরে একটা শাদা টিশার্টের ছবি আঁকা। হাতে নিয়ে কয়েক পাতা উল্টাতেই একটা স্থুল গরুর ছবিও দেখতে পেলাম। উপরে লেখা “গুডবাই ব্লু মনডে।”
বইয়ের পাতার ভিতর থেকে একটা মাথা বের হয়ে এলো, ‘কী মিয়া, লাল বইটা পড়ছিলা? না পড়লে বাদ দ্যাও। এইটাও বাদ দিয়া যাওগা বাসায়।’

কেউ আমাদের দেখছে কিনা ভাবলাম। না, দোকানের লোকজন যার যার কাজে ব্যস্ত। এই কোণার দিকে কারও নজর নেই। নিচু গলায় বললাম, ‘আরে আপনাকে এবার চিনেছি। কী আশ্চর্য!’
‘চিনা কী কচুডা লাভ হইছে?’
‘এই যে আপনার বই পড়ব।’
‘এইটা ফালতু বই। ভাল বই বাদ দিয়া এই বই পইড়া কী লাভ?’
‘নিজের বইকে ফালতু বলছেন?’

জবাব না দিয়ে লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেলেন এরপর।

লাল বই বাদ দিয়ে এক শীতকালে আমি কমলা বইটাই পড়তে শুরু করলাম।
নন-সেন্স ধরণের কাহিনী। যেন বা মেটাফিকশন।

এক সায়েন্স ফিকশন রাইটার জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে খ্যাতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। তার উপন্যাসেরই এক চরিত্র নিজেকে ভাবছে মেশিন। এরা দুজনেই আবার যেন বা কমলা বইটা যে লিখেছেন তার সৃষ্ট চরিত্র। লেখক নিজেও আছেন বিভিন্ন যায়গায় এঁদের সঙ্গে। এবং আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একটা নির্দিষ্ট যায়গায় এরা একে অন্যের মুখোমুখি হবে, এমন করে কাহিনী এগোচ্ছে।

অবাক হয়ে টুকরো টুকরো ঘটনার জোড়াতালি দেয়া বইটা পড়তে থাকি। একেবারে যা তা কাহিনী। মনে মনে কয়েকবার বলি। কিন্তু হাত থেকে নামাতে পারিনা। এ কেমন বই? পড়তে পড়তে মাঝরাতে শব্দ করে হেসে ওঠে বাসার লোকজনের ঘুম ভাঙিয়ে দেই। আবার কখনও গম্ভীর হয়ে উঠি।

উপন্যাসটির যে চরিত্র সায়েন্স ফিকশন রাইটার, তার একটা বইয়ের সারসংক্ষেপ এখানে বলা যাক।

পৃথিবীতে খুব অসুখ। খুব যুদ্ধ। মানুষের দুর্দশায় সমব্যাথি হয়ে উন্নত এক গ্রহ থেকে এলিয়েনরা তাদের সেরা লোকটিকে পৃথিবীতে পাঠালো। এদের নাম সম্ভবত মাগো। মাগোরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানুষের চেয়ে অগ্রগামী। যুদ্ধ ও অসুখ থামানোর যথার্থ সমাধান আছে তাদের। কিন্তু এরা মানুষের ভাষায় কথা বলেনা। যোগাযোগ করে পাদ মেরে ও ট্যাপড্যান্সের মুদ্রায়। তো, মাগো আমেরিকান এক ঘরের উঠোনে ল্যান্ড করলো এক রাতে। প্রথমেই যে ঘর পেল সে ঘরে নক দিল। উন্নত হলেও মাঝরাতে এক আমেরিকান ঘরে নক করার সামাজিকতা তো সে জানেনা।

এক মহিলা দরজা খুলল। মাগো তাকে বললো যে সে এসেছে ভীনগ্রহ থেকে। তার কাছে আছে যুদ্ধ ও ব্যাধি থামিয়ে দেয়ার অব্যার্থ সমাধান।

কিন্তু এসব কথা মহিলা কীভাবে বুঝবে? মাগো তো মানুষের ভাষায় কথা বলেনা। তিনই দেখলেন এক উদ্ভট জন্তু তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পাদ মারছে আর ট্যাপ ড্যান্স করছে।
ভয় পেয়ে একটা বেসবল ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে তিনি মাগোর ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলেন।
ব্যাস, এভাবেই পৃথিবী আর কোন সমাধান পেলনা। থামলোনা যুদ্ধ।

নন-সেন্স ন্যারেটিভের আড়াল নিয়ে বইটি আমেরিকান কালচার ও আমেরিকান ড্রিমের ফাকিঝুকি নিয়ে এমন সব বিদ্রূপ করতে সফল হয় যে আমি চমকে উঠেছিলাম শেষ করে। শুধু কি আমেরিকান কালচার?

আধুনিক বিশ্বের যাবতীয় মূল্যবোধ, বেঁচে থাকা, আর প্রতিষ্ঠিত ধ্যানধারণাকেই যেন ব্যঙ্গ করতে চায় “চিরবিদায় বিষণ্ণ সোমবার।” ফ্রি উইল কী জিনিস, জীবনের কী উদ্দেশ্য, আধুনিকতা ও মানুষের হিংস্রতা, এইসব বিষয়ের উত্তর খুঁজতে যেন কৌতুকের ছলে আহ্বান জানান লেখক। কিংবা কিছুই জানান না।

যেন বা লেখক জানেন, চাইলেই এ বই আপনি পড়ে ভুলে যেতে পারেন, এতে কারও কিছু আসে যায়না। কিন্তু যদি ভুলে না যান, আপনি তো মনেই রাখবেন।

এখন মনে হচ্ছে, মার্কিন উপন্যাসিক কার্ট ভনেগাটের “ব্রেকফাস্ট অব চ্যাম্পিয়ন” কেন আমার পছন্দের বই, সেটা এলোমেলো উপায়ে বলা গেল সবাইকে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত লাল বইটা যদিও এখনও পড়া হয়নি, অনেকেই চিনবেন, স্লটারহাউজ-ফাইভ

কিছুদিন আগে বইটি আবার পড়তে গিয়ে মনে হল, পৃথিবীর এক প্রান্তের সঙ্গে আরেক প্রান্তের দূরত্ব এমন ঘুচে গেছে, এ বই বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক মূলত। নইলে এর কালো কৌতুকগুলো এত গভীরভাবে মগজে কেন কেটে কেটে বসে যায় আমার?

সে চিন্তা থেকেই ভাবলাম ব্রেকফাস্ট অব চ্যাম্পিয়ন্স‘র বাংলায় অনুবাদ করা যাক। নাম প্রায় একই থাকবে। চ্যাম্পিয়নদের ব্রেকফাস্ট। ধীরে ধীরে করব কাজটা, নিজের অন্যান্য লেখার পাশাপাশি।

ভনেগাট বড় লেখক, মানে তাকে খালি চোখে অসিরিয়াস মনে হয়, এই সফল ভ্রমই তাকে বড় করে তুলেছে।


চ্যাম্পিয়নদের ব্রেকফাস্ট বইটির ধারাবাহিক বাংলা অনুবাদ দ্রুতই প্রকাশিত হবে উপন্যাসিক এনামুল রেজার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট-এ। পড়তে চোখ রাখুন।

লেখা সম্পর্কে মতামত জানাতে ফেসবুক অথবা ইমেল ব্যবহার করুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s